প্রধানমন্ত্রীরদপ্তর

দক্ষিণ কোরিয়া সফরকালে ভারত – কোরিয়া বাণিজ্য সিম্পোসিয়ামে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ

Posted On: 22 FEB 2019 5:07PM by PIB Kolkata

নয়াদিল্লি, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

 

 

মাননীয় মহামহিম,

 

বাণিজ্য, শিল্প ও শক্তি মন্ত্রী ইয়োনমো সুং,

 

বিশিষ্ট শিল্পপতিগণ,

 

বন্ধুগণ,

 

শুভ অপরাহ্ন। সিওলে আজ আপনাদের সকলের সঙ্গে মিলিত হতে পারে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। বিগত বারো মাসে কোরিয়ার শিল্পপতিদের সঙ্গে এটি আমার তৃতীয় বৈঠক। এই বৈঠক পারস্পরিক নৈকট্যের প্রতিফলন। আরও বেশি সংখ্যায় কোরিয়ার শিল্পপতিরা ভারতে বাণিজ্যের ব্যাপারে নজর দিক, এটাই আমার অভিপ্রায়। আমি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলাম, তখন দক্ষিণ কোরিয়া সফরে এসেছিলাম। দক্ষিণ কোরিয়া তখন যেমন ছিল, আজও আর্থিক অগ্রগতির দিক থেকে আদর্শ অনুসরণকারী এক দেশ হিসাবে ঠিক তেমনই রয়েছে।

 

বন্ধুগণ,

 

১২৫ কোটি মানুষের দেশ, বর্তমান এই ভারত এক ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলেছে। কৃষি-ভিত্তিক অর্থনীতির এই দেশটি এখন শিল্প ও পরিষেবা পরিচালিত অর্থনীতি হয়ে উঠছেএই দেশ এমন এক অর্থনীতির দেশ হয়ে উঠেছে, যা এখন সমগ্র বিশ্বে আন্তঃসংযোগকারী দেশের ভূমিকা পালন করছে। যে অর্থনীতি এক সময়ে তার লালফিতের ফাঁসের জন্য পরিচিত ছিল, তা এখন লাল কার্পেট বিছিয়ে সকলকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।

 

ভারত এখন বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার দেশ হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠেছেআমরা যখন ‘ভারতীদের স্বপ্ন পূরণ’ – এর লক্ষ্যে কাজ করি, তখন আমরাও সমমানসিকতাসম্পন্ন অংশীদার দেশের খোঁজ করি। স্বাভাবিকভাবেই এই দেশগুলির মধ্যে আমরা দক্ষিণ কোরিয়াকে এক প্রকৃত অংশীদার দেশ হিসাবে গণ্য করি। ভারত – কোরিয়া বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিগত দশকে এক লম্বা পথ অতিক্রম করেছে। বিগত কয়েক বছরে এই সম্পর্ক গভীর হয়েছেভারত এখন দক্ষিণ কোরিয়ার অগ্রণী ১০টি বাণিজ্যিক অংশীদারদের একজন। কোরিয়ার পণ্যসামগ্রী রপ্তানির দিক থেকে ষষ্ঠ বৃহত্তম গন্তব্য হয়ে উঠেছে। আমাদের বাণিজ্যিক লেনদেনের পরিমাণ ২০১৮-তে ২১.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ২০৩০ নাগাদ ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নিয়ে যেতে সুসংহত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি দ্রুত রূপায়ণের বিষয়ে পারস্পরিক বোঝাপড়া ত্বরান্বিত হয়েছে। কেবল বাণিজ্যিক লেনদেনই নয়, লগ্নির দিক থেকেও আমরা ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। ভারতে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।

 

বন্ধুগণ,

 

২০১৫’য় আমার কোরিয়া সফরের পর, আমরা ইনভেস্ট ইন্ডিয়া উদ্যোগের আওতায় সেদেশের লগ্নিকারীদের যাবতীয় সহায়তা প্রদানে ‘কোরিয়া প্লাস’ সুবিধা প্রদান কেন্দ্রের সূচনা করি। সেদেশের হুন্ডাই, স্যামসাঙ, এলজি ইলেক্ট্রনিক্স এখন ভারতে এক বিশ্বাসযোগ্য ব্র্যান্ড হয়ে উঠেছে। শীঘ্রই মোটরগাড়ি উৎপাদক সংস্থা ‘কিয়া’ বিশ্বাসযোগ্যতার ব্র্যান্ড তালিকায় সামিল হতে চলেছে। ভারতে ৬০০-রও বেশি দক্ষিণ কোরিয় সংস্থা বিনিয়োগ করেছে। আরও বেশি সংখ্যক সংস্থা বিনিয়োগে এগিয়ে আসার ব্যাপারে আমরা প্রত্যাশী। এই লক্ষ্যে গত বছরের অক্টোবর মাস থেকেই দক্ষিণ কোরিয়ার নাগরিকদের জন্য ভারতে আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই ভিসা প্রদান ব্যবস্থা চালু করেছি। ভারতে দক্ষিণ কোরিয়ার যে বাণিজ্যিক কার্যালয়গুলি রয়েছে, আমরা সেগুলিকে উৎসাহ দিচ্ছি। সম্প্রতি আমেদাবাদে এ ধরণের ষষ্ঠ কার্যালয়টি চালু হওয়ায় আমি অত্যন্ত আনন্দিত। ভারতে এখন কি হচ্ছে, এ ব্যাপারে আমি আরও কিছু বলতে চাই। আমরা অদূর ভবিষ্যতেই ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হয়ে উঠব। বিশ্বের অন্য কোনও দেশের অর্থনীতিতে বিগত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে ৭ শতাংশের বেশি অগ্রগতি হয়নি। আমাদের অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি সুদৃঢ় হওয়ার ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে। অভিন্ন পণ্য ও পরিষেবা করের মতো কঠোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিগত চার বছরে, সহজে ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশ্ব ব্যাঙ্কের সূচকে ভারত ৬৫ ধাপ উন্নতি করে ৭৭তম স্থানে উঠে এসেছে। আগামী বছর আমরা ৫০তম স্থানে উঠে আসতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। আজ আমরা প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের দিক থেকে অন্যতম উদারীকরণের দেশ হয়ে উঠেছি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশের বেশি বৈদেশিক বিনিয়োগে সরাসরি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই অনুমোদনের ফলে আমরা বিগত চার বছরে ২৫০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছি।

 

বন্ধুগণ,

 

ভারতে আমরাও সার্বিক বিকাশ ও সামগ্রিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়েছি। এই লক্ষ্যেই আমরা আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছি। বিগত তিন বছরে আমরা, যাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ছিল না, তাঁদের জন্য ৩০ কোটি নতুন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলেছি। এখন প্রায় ৯৯ শতাংশ ভারতীয় পরিবারে অন্তত একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এমনকি, এই অ্যাকাউন্টগুলিতে সঞ্চিত অর্থের পরিমাণ ১২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এখন এই মানুষেরা সহজেই পেনশন ও বিমার সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। মুদ্রা যোজনার মাধ্যমে আমরা ৯০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ক্ষুদ্র ঋণ সহায়তা দিয়েছি। বিগত তিন বছরে ১২ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষকে এই ঋণ সহায়তা দেওয়া হয়েছেঋণ গ্রহীতাদের ৭৪ শতাংশই মহিলা। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ছিল না, এমন মানুষের কাছে সরকারি ভর্তুকি ও পরিষেবা পৌঁছে দিতে আমরা বায়ো মেট্রিক যাচাই ব্যবস্থা, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ও মোবাইল ফোনের সুবিধাকে কাজে লাগাচ্ছি। এই সকল ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি সুযোগ-সুবিধা সরাসরি সুবিধাভোগীদের কাছে স্থানান্তরিত করা হচ্ছে, যার ফলে অপচয় দূর করা গেছে। গ্রামীণ বৈদ্যুতিকীকরণেও আমরা ব্যাপক প্রয়াস গ্রহণ করেছি। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে অসামান্য সাফল্যের নিদর্শন-স্বরূপ ভারতের ভূমিকা সারা বিশ্বে স্বীকৃতি পেয়েছে। পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি ক্ষেত্রে আমরা বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম উৎপাদনকারী দেশ হয়ে উঠেছি। আন্তর্জাতিক সৌরজোট গঠনের ক্ষেত্রে আমাদের উদ্যোগের ফলস্বরূপ এক পরিবেশ-বান্ধব বিশ্ব অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে ভারত অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। এ ধরণের অর্থনীতি গড়ে তোলাই হ’ল পরিবেশ-বান্ধব ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার। এই সমস্ত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমেই দেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন যেমন আসবে, তেমনই প্রশাসন ও জনপরিষেবা ব্যবস্থাতেও রূপান্তর ঘটবে।

 

বন্ধুগণ,

 

অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে বিশ্ব মানের পরিকাঠামোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ভারতে পরিবহণ, শক্তি, বন্দর, জাহাজ নির্মাণ, আবাসন এবং শহরাঞ্চলীয় পরিকাঠামো ক্ষেত্রে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এই ক্ষেত্রগুলিতে কোরিয়ার প্রযুক্তিগত দক্ষতা অতুলনীয়। আমাদের হিসাব অনুযায়ী ২০২২ সাল নাগাদ পরিকাঠামো ক্ষেত্রে ৭০০ বিলিয়ন ডলার লগ্নির প্রয়োজনীয়তা রয়েছেশহরাঞ্চলীয় সুযোগ-সুবিধায় অগ্রগতির পাশাপাশি, স্মার্ট শহর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সঠিক লক্ষ্যে অগ্রসর হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কারণ, এই ধরণের নীতি সকলের জন্য এক উজ্জ্বল ও দূষণমুক্ত পরিবেশ সুনিশ্চিত করে। ভারতের মোট জনসংখ্যার ৫০ কোটি মানুষ ২০২৫ সাল নাগদ শহরে বসবাস করবেন। এই বিষয়টি ভারতে স্মার্ট সিটি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতার ব্যাপক সুযোগ এনে দিয়েছে। ভারতের পরিকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতার গুরুত্বের বিষয়টিকে স্বীকার করে নিয়ে ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া ১০ বিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তা দিতে একাধিক ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করেছে। উদাহরণ-স্বরূপ মোটরগাড়ি শিল্পের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। জাতীয় বিদ্যুৎ-চালিত গতিময়তা মিশনের উদ্দেশ্যই হ’ল সুলভে কার্যকর বৈদ্যুতিন যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো। বৈদ্যুতিন যানবাহন উৎপাদনের দিক থেকে উত্তর কোরিয়া এক অগ্রণী দেশ। ভারতে এই ক্ষেত্রটিতে বিপুল সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।

 

বন্ধুগণ,

 

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে গবেষণা ও উন্নয়ন অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে চলেছে। আমরা মনে করি, এক্ষেত্রে সরকারের সহায়ক সুবিধা প্রদানের ভূমিকা রয়েছে। শিল্পের বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালনের অঙ্গ হিসাবে ভারতে নতুন শিল্প স্থাপনের অনুকূল বাতাবরণ গড়ে তুলতে বিগত চার বছরে আমরা ১.৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি স্টার্ট আপ ইন্ডিয়া শুরু করেছি। রাষ্ট্রপতি মুনের সুদক্ষ নেতৃত্বে দক্ষিণ কোরিয়াও স্টার্ট আপ এবং যৌথ উদ্যোগে শিল্প স্থাপনের এক অনুকূল বাতাবরণ গড়ে তোলার লক্ষ্যে মূলধনী সহায়তা বাড়াতে ৯.৪ বিলিয়ন ডলারের এক তহবিল গঠন করেছে। ভারত – কোরিয়া স্টার্ট আপ কেন্দ্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের উদ্দেশ্য হ’ল – কোরিয়ার স্টার্ট আপ এবং ভারতীয় মেধার মধ্যে অবাধ সংযোগ স্থাপন করা। ভারতে কোরিয়ার স্টার্ট আপগুলিকে সহায়তার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় তথ্য প্রযুক্তি শিল্প প্রসার এজেন্সি বেঙ্গালুরুতে ইতিমধ্যেই একটি কার্যালয় চালু করেছে। উদ্ভাবন ক্ষেত্রে উভয় দেশই ভারত-কোরিয়া ভবিষ্যৎ কৌশল প্রণয়ন গোষ্ঠী এবং ভারত – কোরিয়া গবেষণা ও উদ্ভাবন সহযোগিতা কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উদ্দেশ্য, গবেষণা, উদ্ভাবন ও শিল্পোদ্যোগ স্থাপনের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার জন্য এক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা।

 

বন্ধুগণ,

 

আমাদের নাগরিকদের স্বপ্ন পূরণে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে একযোগে কাজ করতে আমরা অত্যন্ত আগ্রহী। সরকারের প্রয়াসগুলি কখনই বাস্তবায়িত হবে না, যদি আপনাদের মতো শিল্পপতিরাও একই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে অগ্রসর না হন। আমি কোরিয়ার এই কথাগুলি উল্লেখ করে আমার ভাষণ শেষ করতে চাই –

 

হুনজা খামিয়ন পল্লী খাজীমন

হামকে খামিয়ন মল্লী খামনিদা

 

এই কথাগুলির অন্তর্নিহিত অর্থের সঙ্গে আমি একমত এবং তা হল – আপনি একা চললে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারেন, কিন্তু আপনি যদি অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে যেতে চান, তা হলে আপনাকে একসঙ্গে অগ্রসর হতে হবে।

 

ধন্যবাদ।

 

অনেক অনেক ধন্যবাদ।

 

 

CG/BD/SB



(Release ID: 1565971) Visitor Counter : 21

Read this release in: English